বীর্যপাতের সময় বা পর ব্যথা (Painful Ejaculation): উপসর্গ, কারণ ও চিকিৎসা
Painful Ejaculation বা Dysorgasmia / Orgasmalgia বলতে বোঝায় এমন এক অবস্থা যেখানে পুরুষরা বীর্যপাতের সময় বা পরে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি অনুভব করেন। আনন্দের মুহূর্তটিই তখন হয়ে ওঠে উদ্বেগের কারণ।
বাংলাদেশে অনেক পুরুষই এ সমস্যা লুকিয়ে রাখেন, ভেবে নেন এটি নিজে থেকেই সেরে যাবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণের ইঙ্গিত দেয় — যেমন সংক্রমণ, প্রদাহ, স্নায়ুর সংবেদনশীলতা বা মানসিক চাপ। সঠিক চিকিৎসা নিলে সাধারণত দ্রুত উন্নতি সম্ভব।
এই ব্যথা কখনো তীব্র, কখনো জ্বালাপোড়ার মতো হয় — সাধারণত লিঙ্গ, অণ্ডকোষ বা নিচের পেলভিক অংশে অনুভূত হয়। এটি বীর্যপাতের আগমুহূর্তে শুরু হয়ে কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো প্রোস্টেট বা মূত্রনালীর সংক্রমণ, স্নায়ুতে চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা মানসিক উদ্বেগ। অনেক সময় শারীরিক ও মানসিক দুই-ই ভূমিকা রাখে।
সমস্যাটি উপেক্ষা করলে এটি আরও জটিল হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে শুধু ব্যথা নয়, যৌন আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসে।
কতটা সাধারণ এই সমস্যা?
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১ থেকে ২৫ শতাংশ পুরুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই সমস্যায় ভোগেন। বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অধিকাংশ পুরুষই এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কেউ হালকা জ্বালাপোড়া অনুভব করেন, কেউ আবার তলপেটে বা পেলভিকে গভীর ব্যথা অনুভব করেন যা যৌন জীবনে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় এটি একা একটি সমস্যা হিসেবে থাকে, আবার কখনো মূত্রজনিত বা ইরেকশন সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
উপসর্গ
লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। কারও জন্য এটি হালকা অস্বস্তি, কারও জন্য দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ব্যথা। অনেক সময় এটি শুধুমাত্র পার্টনারের সঙ্গে যৌনমিলনের সময় হয়, কিন্তু হস্তমৈথুনে হয় না — যা মানসিক কারণের ইঙ্গিত হতে পারে।
সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বীর্যপাতের আগে, চলাকালে বা পরে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
- লিঙ্গ, অণ্ডকোষ, পেরিনিয়াম (anus-এর সামনে অংশ) বা তলপেটে অস্বস্তি
- বীর্যপাতের পর প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
- সংক্রমণ থাকলে প্রস্রাবের ঘন ঘন চাপ বা স্রাব
বারবার এই ব্যথা হলে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং যৌন জীবনে মানসিক চাপ তৈরি হয়।
সম্ভাব্য জটিলতা
চিকিৎসা ছাড়া রাখলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
- যৌন কর্মক্ষমতায় প্রভাব: দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা যৌন ইচ্ছা কমিয়ে দেয় বা ইরেকশন সমস্যার কারণ হতে পারে।
- সম্পর্কে টানাপোড়েন: যৌন অস্বস্তি ও মানসিক চাপ পার্টনারশিপে দূরত্ব তৈরি করে।
- বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি: যৌন পরিহার বা বীর্যনালীর বাধা থাকলে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে।
- মানসিক সমস্যা: দীর্ঘদিনের ব্যথা হতাশা, অপরাধবোধ বা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
সমস্যার মূল কারণ আগে থেকেই শনাক্ত করলে এসব জটিলতা সহজেই এড়ানো যায়।
মূল কারণসমূহ
বাংলাদেশি পুরুষদের মধ্যে ব্যথাযুক্ত বীর্যপাতের প্রধান কারণগুলো হলো সংক্রমণ, প্রদাহ, অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা, ওষুধের প্রভাব বা মানসিক চাপ।
১. মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI)
পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলক কম হলেও UTI হলে বীর্যপাত বা প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া হয়। ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, মেঘলা প্রস্রাব বা জ্বর এর সঙ্গে থাকতে পারে। চিকিৎসা না করলে এটি প্রোস্টেট বা কিডনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. যৌনবাহিত রোগ (STI)
ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া, সিফিলিস, ট্রাইকোমোনিয়াসিস, হারপিস— এ ধরনের সংক্রমণ প্রোস্টেট বা ইউরেথ্রায় প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা বীর্যপাতের সময় ব্যথা বাড়ায়। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না করলে পার্টনারের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
৩. প্রদাহজনিত সমস্যা
প্রজনন অঙ্গের প্রদাহ ব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ।
- ইউরেথ্রাইটিস: মূত্রনালীর প্রদাহ, যা প্রস্রাব বা বীর্যপাতের সময় জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে।
- প্রোস্টাটাইটিস: প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ; ৩০ বছরের পর এটি বেশি দেখা যায় এবং অনেক সময় বীর্যের সঙ্গে রক্তও আসতে পারে।
- এপিডিডাইমাইটিস: অণ্ডকোষের পেছনের স্পার্ম-সংরক্ষণকারী নালীতে প্রদাহ; অর্গাজমের সময় অণ্ডকোষে ব্যথা বাড়ে।
- অর্কাইটিস: এক বা দুই অণ্ডকোষে সংক্রমণ বা ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে ফুলে ব্যথা হওয়া।
৪. ইজাকুলেটরি ডাক্টে বাধা
বীর্য বহনকারী নালী ছোট পাথর বা অস্ত্রোপচারের পর সৃষ্ট টিস্যু দ্বারা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে চাপ তৈরি হয়ে পেলভিক বা টেস্টিকুলার ব্যথা হয়, কখনো বীর্যের পরিমাণ কমে যায় বা রক্ত দেখা দেয়।
৫. অস্ত্রোপচারের পর স্নায়ু উত্তেজনা
প্রোস্টেট বা হার্নিয়া সার্জারির পর আশপাশের স্নায়ু সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে, যা অস্থায়ীভাবে বীর্যপাতের সময় ব্যথা সৃষ্টি করে।
৬. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, SNRI বা মাসল রিল্যাক্স্যান্ট ওষুধ স্নায়ু সঞ্চালনে প্রভাব ফেলে ব্যথা বাড়াতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ পরিবর্তন করলে সমস্যা সাধারণত কমে যায়।
৭. স্নায়ু বা পেলভিক ফ্লোর সমস্যা
Pudendal nerve entrapment বা Chronic Pelvic Pain Syndrome (CPPS) দীর্ঘস্থায়ী যৌনাঙ্গের ব্যথার কারণ হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে বীর্যপাতের পর ব্যথা কমে, কারও ক্ষেত্রে বাড়ে। সঠিক ফিজিওথেরাপি অনেক সময় কার্যকর হয়।
৮. অপরিচ্ছন্নতা বা ঘর্ষণ
বারবার যৌনক্রিয়া বা হস্তমৈথুনের পর পরিচ্ছন্নতা না রাখলে বা লুব্রিকেশন ছাড়া করলে ত্বকে সংক্রমণ বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। ভালো হাইজিন বজায় রাখলে এই সমস্যা সহজেই প্রতিরোধ করা যায়।
৯. মানসিক কারণ
শারীরিক সমস্যা না থাকলে মানসিক চাপ, অপরাধবোধ বা পারফরম্যান্স উদ্বেগও ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে ব্যথা কেবল পার্টনারের সঙ্গে হয়, সেখানে কাউন্সেলিং বা থেরাপি বেশ ফলপ্রসূ।
ঝুঁকির কারণ (Risk Factors)
- প্রোস্টেট সমস্যা, পেয়ারোনির রোগ বা ডায়াবেটিস
- লিঙ্গ, প্রোস্টেট বা মূত্রথলিতে অস্ত্রোপচারের ইতিহাস
- ঘন ঘন ইউরিনারি বা যৌনাঙ্গ সংক্রমণ
- দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত বা অটোইমিউন রোগ
- পেলভিক অঞ্চলের স্নায়ুজনিত সমস্যা
- জন্মগত প্রজনন অঙ্গের বিকৃতি (যেমন Zinner syndrome)
- অসুরক্ষিত যৌন আচরণ
- অপরিচ্ছন্ন বা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস
বাংলাদেশে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া এবং নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া এ ঝুঁকি আরও বাড়ায়। প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ শনাক্ত করলে জটিলতা কমানো সম্ভব।
ডায়াগনোসিস (রোগ নির্ণয়)
অনেক পুরুষ এই সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে লজ্জা পান, কিন্তু সঠিক নির্ণয়ই মূল সমাধান। বাংলাদেশে ইউরোলজিস্ট ও সেক্সোলজিস্টরা সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে এই সমস্যা দেখেন।
রোগ নির্ণয়ে সাধারণত করা হয় —
- বিস্তারিত চিকিৎসা ও যৌন ইতিহাস পর্যালোচনা
- লিঙ্গ, অণ্ডকোষ ও প্রোস্টেট পরীক্ষা
- মূত্র ও বীর্য পরীক্ষা সংক্রমণ নির্ণয়ে
- STI টেস্ট যৌনবাহিত রোগ চিহ্নিত করতে
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রোস্টেট বা ডাক্টে বাধা যাচাইয়ে
- ডিজিটাল রেকটাল এক্সাম (DRE) প্রোস্টেটের অবস্থা নির্ধারণে
- পেলভিক ফ্লোর অ্যাসেসমেন্ট পেশি টান বা দুর্বলতা নির্ধারণে
কারণ জানা গেলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, ফিজিওথেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন।
চিকিৎসা পদ্ধতি
চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওষুধ ও সহজ জীবনযাপন পরিবর্তনে উন্নতি দেখা যায়। নিজের মতো করে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
চিকিৎসার প্রধান ধাপগুলো:
- অ্যান্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ (UTI/STI) সারাতে ব্যবহৃত।
- আলফা-ব্লকার (Tamsulosin): প্রোস্টেটের মাংসপেশি শিথিল করে চাপ কমায়।
- অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (NSAIDs): প্রদাহ বা ব্যথা কমাতে সহায়ক।
- নার্ভ থেরাপি: স্নায়ু সম্পর্কিত ব্যথায় ব্যবহৃত ওষুধ বা ইনজেকশন।
- পেলভিক ফ্লোর ফিজিওথেরাপি: পেশি শিথিল করে ব্যথা কমায়।
- প্রোস্টেট ম্যাসাজ / বায়োফিডব্যাক: রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে পেলভিক কনজেশন হ্রাস করে।
- কাউন্সেলিং বা সেক্স থেরাপি: মানসিক উদ্বেগ বা পারফরম্যান্স স্ট্রেস থাকলে কার্যকর।
বাংলাদেশে সমন্বিত চিকিৎসা — অর্থাৎ মেডিকেল ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা একসঙ্গে — সবচেয়ে সফল ফল দেয়। নিজে থেকে ওষুধ বা “হারবাল টনিক” নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রতিরোধ ও যত্ন
সুস্থ অভ্যাস ও সচেতনতা অনেকাংশে এই সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারে:
- নিরাপদ যৌন আচরণ ও কনডম ব্যবহার
- যৌনাঙ্গ পরিষ্কার রাখা
- পর্যাপ্ত পানি পান ও সুষম খাদ্যগ্রহণ
- নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার
- মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা
বাংলাদেশে সাধারণ সতর্কতা: অনেক পুরুষ দ্রুত ফলের আশায় ওষুধ বা অনলাইন রেমেডি ব্যবহার করেন। এসব পদ্ধতি আসল কারণ ঢেকে রাখে, সারায় না। নির্ভরযোগ্য ইউরোলজিস্টের পরামর্শই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পথ।
পরবর্তী করণীয়
বীর্যপাতের সময় ব্যথা ভয় বা লজ্জার কারণ নয় — এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করবেন, তত দ্রুত আরাম পাওয়া যাবে। সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসা যৌন আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে এবং জীবনের গুণগত মান উন্নত করে।