টেস্টিকুলার পেইন: উপসর্গ, কারণ ও এর মানে কী
টেস্টিকুলার পেইন এমন একটি বিষয় যা বেশিরভাগ পুরুষ সহজে উপেক্ষা করতে পারেন না। ব্যথা যদি হঠাৎ তীব্র হয় বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা ভারী অনুভূতি হয়—দুটোই দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে অনেক পুরুষই লজ্জা বা অস্বস্তির কারণে এ বিষয়ে কথা বলেন না, কিন্তু টেস্টিকুলার পেইনের কারণ হতে পারে নানা ধরনের। কিছু সমস্যা সময়ের সাথে কমে যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
টেস্টিকল অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ—এতে প্রচুর স্নায়ু থাকে। তাই সামান্য আঘাতও অনেক বেশি ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। অনেকে ক্যানসারের ভয় পান, কিন্তু সাধারণত টেস্টিকুলার ক্যানসার ব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। বরং হঠাৎ তীব্র ব্যথা সাধারণত টেস্টিকুলার টর্শনের মতো জরুরি অবস্থার সাথে বেশি সম্পর্কিত।
টেস্টিকুলার পেইন কেমন অনুভূত হয়?
এই ব্যথা কখনো হঠাৎ শুরু হতে পারে, আবার ধীরে ধীরে বাড়তেও পারে। কখনো ব্যথা শুধু একটি টেস্টিকলে থাকে, আবার কখনো তা কুঁচকি, তলপেট বা পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা “রেফার্ড পেইন”—অর্থাৎ উৎস অন্য জায়গায় হলেও ব্যথা টেস্টিকলে অনুভূত হয় (যেমন: কিডনি স্টোন)।
আপনি আরও যে উপসর্গগুলো লক্ষ্য করতে পারেন:
- টেস্টিকলে ফোলা বা স্পর্শে ব্যথা
- স্ক্রোটামে লালভাব বা উষ্ণতা
- ভারী বা চাপের অনুভূতি
- বমিভাব বা বমি
- জ্বর বা শরীর ঠান্ডা লাগা
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা
- বীর্যপাতের সময় ব্যথা
- টেস্টিকল বা স্ক্রোটামে গাঁট
- প্রস্রাব বা বীর্যে রক্ত
এই উপসর্গগুলো চিকিৎসককে কারণ নির্ণয়ে সাহায্য করে।
টেস্টিকুলার পেইনের সম্ভাব্য কারণ
টেস্টিকুলার পেইন সংক্রমণ, প্রদাহ, আঘাত, রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা বা আশপাশের অঙ্গের সমস্যার কারণে হতে পারে। নিচে প্রতিটি কারণ সহজ ও স্বাভাবিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো।
এপিডিডাইমাইটিস
টেস্টিকলের পেছনের কুণ্ডলী করা নালি (এপিডিডাইমিস)–এ প্রদাহ হলে এপিডিডাইমাইটিস হয়।
সাধারণ কারণ:
- STI (ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া)
- UTI
- প্রোস্টেট ইনফেকশন
- আঘাত
- ক্যাথেটার ব্যবহারের ইতিহাস
সম্ভাব্য উপসর্গ:
- স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া ও ব্যথা
- স্ক্রোটামে লালভাব ও উষ্ণতা
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা
- জ্বর বা ঠান্ডা লাগা
- পুরুষাঙ্গ থেকে স্রাব
অর্কাইটিস
এক বা দুই টেস্টিকলে প্রদাহ হলে অর্কাইটিস হয়। মাম্পস বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ এর সাধারণ কারণ।
উপসর্গ:
- হঠাৎ তীব্র ব্যথা
- টেস্টিকল ফুলে যাওয়া
- জ্বর বা ঠান্ডা লাগা
- বমিভাব
- প্রস্রাব বা বীর্যপাতের সময় ব্যথা
টেস্টিকুলার টর্শন (জরুরি অবস্থা)
টেস্টিকলের সাথে যুক্ত স্পারম্যাটিক কর্ড ঘুরে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে টর্শন হয়। এটি জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য কারণ:
- জন্মগত bell-clapper deformity
- আঘাত
- হঠাৎ নড়াচড়া
- কৈশোরে দ্রুত বৃদ্ধি
- অতিরিক্ত ঠান্ডা
উপসর্গ:
- হঠাৎ তীব্র ব্যথা
- স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া
- তলপেটে ব্যথা
- বমিভাব বা বমি
- একটি টেস্টিকল উপরের দিকে উঠে যাওয়া
টেস্টিকুলার ট্রমা বা আঘাত
টেস্টিকল তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও সংবেদনশীল, তাই খেলাধুলা, দুর্ঘটনা বা সরাসরি আঘাতে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
উপসর্গ:
- তীব্র, তাৎক্ষণিক ব্যথা
- ফোলা বা রক্তজমাট
- বমিভাব
- প্রস্রাবে রক্ত
- হাঁটতে অসুবিধা
ইনগুইনাল হার্নিয়া
পেটের টিস্যু দুর্বল স্থানে চাপ দিলে হার্নিয়া হয় এবং ব্যথা স্ক্রোটাম পর্যন্ত যেতে পারে।
উপসর্গ:
- কুঁচকি বা স্ক্রোটামে গাঁট
- টেস্টিকলে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
- ভারী লাগা
- ওজন তুললে ব্যথা বাড়া
কিডনি স্টোন
কিডনি স্টোন শরীরের নিচের দিকে নেমে এলে ব্যথা টেস্টিকলে অনুভূত হতে পারে।
উপসর্গ:
- পাশের দিকে তীব্র ব্যথা
- ব্যথা নিচে নেমে টেস্টিকলে যাওয়া
- প্রস্রাবে রক্ত
- বমি বা বমিভাব
- ঘন ঘন বা ব্যথাযুক্ত প্রস্রাব
ভেরিকোসিল
স্ক্রোটামের শিরা বড় হয়ে গেলে dull-aching ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
উপসর্গ:
- মৃদু, টানা ব্যথা
- বড় বা দৃশ্যমান শিরা
- স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া
- ভারী লাগা
- কখনো বন্ধ্যাত্বের সমস্যা
হাইড্রোসিল
টেস্টিকলের চারপাশে তরল জমে হাইড্রোসিল হয়। সাধারণত ব্যথাহীন, কিন্তু বড় হলে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
উপসর্গ:
- স্ক্রোটামে ফোলা
- হালকা ব্যথা বা ভারী অনুভূতি
- বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকলে অস্বস্তি বাড়া
টেস্টিকুলার টিউমার
টেস্টিকলের ভেতরে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যথাহীন গাঁট দিয়ে শুরু হয়।
উপসর্গ:
- ব্যথাহীন গাঁট
- ভারী লাগা
- মাঝে মাঝে পিঠ বা তলপেটে ব্যথা
- বিরল ক্ষেত্রে স্তন নরম হওয়া
পোস্ট-ভ্যাসেকটমি পেইন সিনড্রোম (PVPS)
ভ্যাসেকটমির কয়েক মাস বা বছর পরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে।
সম্ভাব্য কারণ:
- স্পারম্যাটিক কর্ডে জ্বালাপোড়া
- স্নায়ু চাপে যাওয়া
- ব্লকেজ
- স্কার টিস্যু
- ইমিউন প্রতিক্রিয়া
- স্পার্ম গ্রানুলোমা
উপসর্গ:
- দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
- বীর্যপাতের সময় ব্যথা
- ফোলা
- ভারী অনুভূতি
রিস্ক ফ্যাক্টর: কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশের সাধারণ স্বাস্থ্য-চর্চা, জীবনযাপন ও যৌন-স্বাস্থ্য অভ্যাসের কারণে কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর বেশি দেখা যায়।
মূল ঝুঁকির কারণ:
- কম বয়সে STI ঝুঁকি বেশি
- আগের আঘাত
- STI বা UTI ইতিহাস
- আগের টেস্টিকল সার্জারি
- পরিবারে টেস্টিকুলার ক্যানসারের ইতিহাস
- ধূমপান
- ভ্যাসেকটমি করা পুরুষ
- স্থূলতা
টেস্টিকুলার পেইন: কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়
- ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস
- উপসর্গের বিবরণ
- টেস্টিকল ও স্ক্রোটামের শারীরিক পরীক্ষা
প্রয়োজনে:
- ইউরিন টেস্ট
- স্ক্রোটাল আল্ট্রাসাউন্ড
- রক্ত পরীক্ষা
- CT বা MRI (বিশেষ ক্ষেত্রে)
দ্রুত রোগ নির্ণয় জরুরি, কারণ কিছু সমস্যা দেরি হলে জটিলতা বাড়ে।
টেস্টিকুলার পেইনের চিকিৎসা
মূল কারণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারিত হয়।
চিকিৎসার উপায়:
- ওভার-দ্য-কাউন্টার ব্যথানাশক
- ঠান্ডা সেঁক
- গরম পানি স্নান
- বিশ্রাম ও স্ক্রোটাম সাপোর্ট
- অ্যান্টিবায়োটিক
- সার্জারি (টর্শন বা টিউমার)
- হাইড্রোসিল বা অ্যাবসেস ড্রেনেজ
- স্ক্রোটাল সাপোর্ট
- ভ্যাসেকটমি রিভার্সাল
- ক্যানসারের ক্ষেত্রে সার্জারি + কেমো/রেডিয়েশন
প্রতিরোধ: কীভাবে টেস্টিকুলার পেইন এড়াবেন
- খেলাধুলায় সুরক্ষামূলক কাপ ব্যবহার
- নিরাপদ যৌনচর্চা
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
- ভারী জিনিস তোলার সময় সতর্ক থাকা